TOP নিউজ

নিজের সর্বনাশ নিজেই করছেন! ফেসবুকের ফাঁদে পা দিয়ে গালি দিচ্ছেন মোদী-রাহুলকে

Loading...

হেব্বি ঝামেলা লেগেছে। ফেসবুক নিয়ে যা তা কাণ্ড! ফেসবুকে আপনার দেওয়া ঠিকুজি-কোষ্ঠী নিয়ে নাকি বিভিন্ন কোম্পানি রাহুল-মোদীদের বিক্রি করে দিচ্ছে। আপনি জানতেই পারছেন না। দেশের মসনদে কে বসবেন, তাও নাকি এই চুরি করা তথ্য দিয়ে ঠিক হয়ে যাচ্ছে। কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে হেব্বি।

এমন কাণ্ড যে, আমাদের পরমপূজ্য ফেসবুকের মালিক পর্যন্ত হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, এমনটা আর হবে নাকো!

আসলে ফেসবুক জানে আপনার মনের কথা। এক বার আপনার মগজ ধোলাই করে দিয়েছে। আপনাকে তাদের ‘বিনা পয়সার শ্রমিক’ বানিয়ে দিয়েছে। আর যায় কোথায়। খালি আপনাকে খাটাচ্ছে আর নিজেরা পয়সা করছে। এর জন্য তো আপনিই দায়ী!

আপনি কোন দিকে যাবেন, তা ওদের জানা হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে বিভিন্ন কোম্পানিরও। ভায়া কোম্পানি রাহুল-মোদীরাও হাড়ে হাড়ে চিনে নিচ্ছেন আপনাকে।

ফেসবুক নিয়ে মনোবিদরা বিস্তর গবেষণা করে ফেলেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে গবেষণা যাঁরা করছেন, তাঁরাও বলছেন, এই ‘লাইক, কমেন্ট, শেয়ার’-এর চক্করে পড়া অনেকটা পোকার আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতোই একটা মানসিক ব্যাপার।

ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ফেসবুকের পাতায় যে আমরা অনবরত ঘুরে বেড়াচ্ছি, তা আসলে আমাদের মানসিক চাহিদা মেটাতেই। একদিকে অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের সব খবর হাতের মুঠোয়। কাউকে কিছু না বলেই ‘ভয়ারের’ মতো যে কারোকে ‘স্টক’ করার স্বাধীনতা। পরনিন্দা-পরচর্চার ও ঝগড়া করার জন্য এ এক আদর্শ স্থান। অন্য দিকে নিজেকে জাহির করার জন্য দু’লাইন লিখে বা ছবি চিপকে পোস্ট করে জানিয়ে দেওয়া, ‘আমি আছি বস্।’ সঙ্গে তো বিনোদনের মালমশলা রয়েছেই।

এই মানসিক চাহিদার সুযোগ পুরোদস্তুর উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক। ভাল করে ভেবে দেখুন তো, ফেসবুকে যা ছবি বা লেখা দেখছেন, তার ৯৯.৯৯ শতাংশ আপনার মতো ইউজারদের। ফেসবুক শুধু কিছু টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। নিজে কিচ্ছুটি আপলোড করছে না। আমার আপনার লেখা আর ছবিকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একে ওকে দেখিয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক এত কোটি কোটি টাকা পাচ্ছে কোথা থেকে তা হলে? আপনার কাছ থেকে তো একটা পয়সাও চাইছে না। আপনাকে দিয়ে খাটিয়ে সব বানিয়ে নিচ্ছে। আর আপনার সব তথ্য অন্য কোম্পানিকে বিক্রি করে টাকা কামাচ্ছে।

আপনি ভাবছেন, আপনার কী এমন তথ্য আছে ফেসবুকে! আপনার কোনও ধারণা নেই, আপনি যে ভাবে আপনার বন্ধু বা অপরিচিতদের ছবি ও লেখা ফেসবুকে চুপিচুপি দেখছেন বা পড়ছেন (কখনও জানিয়েও), ঠিক সেভাবেই ফেসবুক আপনাকে ধাওয়া করছে। চুপিচুপি।

কারও সঙ্গে দেখা হল পার্টিতে। পরের দিন কী করে তাঁরই ফেসবুক প্রোফাইল আপনার ‘ফ্রেন্ডস সাজেশন’-এ চলে আসে? আপনি অপরিচিত কারও প্রোফাইলে দু’দিন ঘুরে এলেই, সেই ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রস্তাব দেয় ফেসবুক। কী করে?

আমেরিকার একটি সংস্থা ৮৬০০০ ফেসবুক ইউজারের উপরে ২০১৫ সালে একটি সমীক্ষা করে দেখেছে, ব্যক্তিগত তথ্য দূরে থাক, কোনও ইউজারের শুধু ‘লাইক’ করা দেখে বলে দেওয়া যায়, তিনি কালোদের পছন্দ না অপছন্দ করেন, তিনি সমকামী কি না, তিনি কোনও সিদ্ধান্ত চট করে নিতে পারেন না দ্বিধায় থাকেন— এরকম হাজার তথ্য।

আর আপনি তো নিজের জন্মানো থেকে পুরনো, নতুন প্রেম, বিয়ে, হনিমুন, ব্রেক আপ, এমনকী কাকে ভোট দিতে চান— সব তথ্য উজাড় করে ফেসবুককে দিয়ে বসে আছেন। সঙ্গে ‘আগের জন্মে কেমন দেখতে ছিলেন’ জানতে গিয়ে ফেসবুকের বাইরের অ্যাপগুলোকেও নিজের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন।

সেই মতো আপনার পছন্দের সব কিছুই আপনাকে দেখাতে শুরু করে ফেসবুক। বাইরের কোম্পানিগুলিও আপনার পছন্দকেই নিশানা করে একই ভাবে। কারণ আপনার তথ্য ওই বাইরের কোম্পানিগুলির কাছে বেচে দিয়েছে আপনার অতি প্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। কখনও ফেসবুককে না জানিয়েই বাইরের কোম্পানিগুলি হাতিয়ে নিয়েছে আপনার তথ্য।

সেই তথ্যই হাত ঘুরে রাহুল-মোদীদের ঘরে গিয়ে পৌঁছচ্ছে।

ফেসবুক প্রধান মার্ক জুকারবার্গের সাফাই:

অনেকে ভাবছেন, আমি বাবা এমন কিছু করি না! আমার সব ‘প্রাইভেসি সেটিংস’ অন। আমি ছবি শেয়ার করি না। শুধু অন্যদের দেখি। আপনিও বিপদের বাইরে নন। আপনার বন্ধু ওই সব অ্যাপগুলোকে অজান্তে বলে দিয়েছে, তাঁর ফ্রেন্ডস্ লিস্টের সবার তথ্যও হাতিয়ে নিতে পারে তারা।

এ তো গেল ফেসবুকের নিজের কথা। দেশের সমস্ত গোয়েন্দা এজেন্সি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকউন্টের উপরে যে নজর রাখছে প্রতিনিয়ত, তা কি জানেন? নিজেদের মতো করে তারা আপনার যে ‘ফাইল’ বানিয়ে নিয়েছে, তা আটকাবেন কী করে!

কখনও ভেবে দেখেছেন, আপনি যে কোম্পানির মোবাইল ব্যবহার করেন না, সেই কোম্পানিও আপনার মোবাইল নম্বর কোথা থেকে জোগাড় করে আপনাকে ফোন করে? আপনার পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানি আপনাকে কেনাকাটা করার পরামর্শ কী করে দেয়? গুগলের কথা অন্যদিন আলোচনা করাই ভাল।

আসলে এ এক বিরাট জাল। এই জালে আপনি পড়ে গিয়েছেন। এই টেক-বিপ্লবের যুগে আপনারই দেওয়া পছন্দ-অপছন্দের হিসেব নিয়ে রাহুল গাঁধী বা নরেন্দ্র মোদী যদি নিজের মতো করে গুছিয়ে আপনাকে নিজেদের ভাল ভাল কথা বলতে থাকেন, তা হলে দোষ কার? ধর্মতলার মোড়ে আপনি লাল লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়েছেন নিজেই। এখন ষাঁড় এসে গুঁতোলে দোষ কাকে দেবেন?

আপনি তো আর বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন না, ‘‘কাল থেকে ফেসবুক আর করব না’’! একটা লাইক না পেলে আপনার বুক ফাটে, আর গোটা একটা জগৎ থেকে আপনি নিজেকে সরিয়ে রাখতে গেলে আপনি তো পাগল হয়ে যাবেন!

স্বীকার করে নিন এই ‘ইনফরমেশনের যুগে’ কিছুই আর ব্যক্তিগত নেই। সুতরাং রাহুল-মোদীকে গালি না দিয়ে আপনি ‘বিনে পয়সার শ্রমিক’ হিসেবেই কাজ করুন। অন্যরা লুটে-পুটে খাক। যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আপনি দেখুন, এই ফাঁদ থেকে নিজে ভাল কিছু পান কি না।

Loading...

Comments

comments