TOP সোশ্যাল

শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

Loading...

সেই যুগটাই ছিল গোপন কথার। গোপন কথা চেপে চেপে পেট ফুলে যেত, রাতে ঘুম হত না। উত্তাল হাওয়ার রাতে মৌসুমী সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত মশারির চালে। জানলার বাইরে চাঁপা গাছে পেঁচা এসে ভুত-ভুতুম করে ডেকে উঠে জানিয়ে যেত— এ কথা গোপন কিন্তু, কারোকে জানিও না। গোপন কথার গন্ধ ছিল জুঁইফুলের মতো। একবার পিছু নিলে সে ছাড়ত না কি!

ptg00141849_57cc7a031dd06_rmqcjo শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

কিন্তু কথা আর কতটা গোপন হতে পারে? পাঁচকান হলে সে আর গোপন নয়। দু’কানেই তার জীবন আর উজ্জীবন। কিন্তু কী সেই গোপন কথা? কারা বলত কার কানে? আর তা বন্ধ হয়েই বা গেল কী করে?

received_1534132570037841_arqzfh শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

পুরনো বাংলার সখিসংবাদ এই মুসাবিদার বিষয় নয়। সে গল্প অন্যত্র বলা যাবে। এই কাহিনির মূলে রয়েছে কেবল কথা। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা আর নিবে যাওয়া নিয়েই হয়তো এই লেখা। আজ থেকে ৭০-৭৫ বছর আগেও বাংলার মহিলা মহলে গোপন কথারা খলবল করে বেড়াত।

মা-পিসি-ঠাকুমারা অন্দরমহলের দ্বন্দ্ব ভুলে যেতেন তোমন গোপন কথা পেলে। সেদ্ধ হতে না-চাওয়া নাছোড়বান্দা ডাল বুট-বুট করে ফুটতেই থাকত একান্নবর্তী উনুনে। ভাতের হাঁড়িতে উথাল-পাথাল হত তুলাইপাঞ্জি চাল। গোপন কথার দল হুড়মুড়িয়ে দাবড়ে বেড়াত জামবাটি, গামলা, কানাউঁচু বোগিথালা। রান্নাঘরের সেই ঘোপন কথা বিকেলের মধ্যেই নেমে আসত আইবুড়ো মহলে। চুলবাঁধার আসরে, বিন্তি খেলার আড্ডায়, পুকুরঘাটে বলে পান্নাসবুজ জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা আলস্যের ঠিক মাঝখানটিতে বুদবুদ উঠত গোপন কথার।

PicsArt_03-19-09.33.57_nocedi শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

এক চক্কর মেরে গোপন কথা চলে যেত আবার বিবাহিত মহলে। তখন রাত নেমেছে। সারা দিনের পরে পানটি সবে গালের এপাশ থেকে ওপাশে গিয়েছে। হা-হদ্দ খেটে খুটে আসা মানুষটার কানে কানে সেই গোপন কথা ঢেলে গিয়ে তবে না শান্তি!। কিন্তু ও মা! সে মিনসে তো ঘুমিয়ে কাদা! কাকে বলা যায় তখন? রাত নামে। জুঁইফুলের গন্ধে ঘুম আসে না। চাঁপার ডালে বলে ভুতুম ঘুট-ঘুট করে একটানা ডেকে যায়। নিশুতির পেটের ভিতরে ফুলতে থাকে কথা। গোপন কথা….

2-36_ryylpm শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

সেই সংস্কৃতি একান্নবর্তী হেঁশেলের সঙ্গে সঙ্গেই লুপ্ত কবেই। গত ৪০ বছরে বেড়েছে ব্যালকনি-সাচার। গোপন কথা তিন প্যাঁচ মেরে রোমিও হয়ে উঠে গিয়েছে শহর-মফস্‌সলের জুলিয়েটদের ঝুলবারান্দায়। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সাইকেল-যুবকেরা দেখেছে সেই দৃশ্য।

চিকন কুমড়োলতা ঢলে পড়ছে অপরাজিতার গায়ে। কানের কাছে চলে যাচ্ছে মুখ। মুখের কাছে চলে আসছে কান। কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে? ভেবে ভেবে সাঁঝ কাবার। কিন্তু সে কথা এতটাই গোপন যে, কোনও দিন তা ব্যালকনি টপকে হাতচিঠি হয়েও তো পৌঁছল না।

গোপন কথার গল্প তো ফুরোয় না বিয়ের পরেও। বরং আইবুড়ো বেলার গোপন কথারা এসে ঢুঁসোয় ভরদুপুরে। হাঁটুর উপরে উঠে যায় বেসামাল শাড়ি, কানের কাছে চলে আসে মুখ-মুকের কাছে চলে আসে কান। গোপন কথাটি গোপন থেকে গোপনতর আস্তানায় ডুবতে থাকে। কান থেকে কানে নিষিদ্ধ ইস্তেহারের মতো ছড়িয়ে যায় গোপন কথা। সে কোনও দিন ওপেন হয় না। কারণ, তার নামটাই তো ‘গোপন কথা’!

88_gixp8e শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

দিন বদলায়। ব্যালকনি থেকে স্কুটির গতিবেগ। গোপন কথারা বেগবতী। হেলমেটের নীচে ঘেমে ওঠে মাথা। জিনসের পকেটে বিজবিজ করে ওঠে স্মার্টফোন। সোশ্যাল মিডিয়া জানায়— ‘গোপন বলে কিছুই হয় না আর!’ মেসেজ বক্সে কথারা জমে। তারা কেউ সেই ‘গোপন কথা’ নয়। কলেজ ক্যান্টিনে কো-এড কালচার টপকে গোপন কথা ধাক্কা মারে, অফিসের পুল কারে ইনক্রিমেন্ট আর অ্যাপ্রাইজাল পেরিয়ে গোপন কথা ধাক্কা মারে। গতি পেয়ে গিয়ে তার জ্বালা আরও বেড়ে গিয়েছে। সে নিজে জ্বলে, অন্যকেও জ্বালায়। হোয়াটস অ্যাপের গ্রুপে, ফেসবুকের চ্যাটে সে বসেত গিয়ে থমকে যায়। শেষ ফাগুনের প্রজাপতির মতো সে ঘুরে বেড়ায় পেজ থেকে পেজ-এ, প্রোফাইল থেকে প্রোফাইলে। বসার জায়গা খোঁজে এখানে ওখানে। কিন্তু ‘সাম্প্রতিকা’রা কি তাকে আর পাত্তা দেন না?

78_tarrfu শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে, কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ তারপর…

মোবাইল সুইচড অফ। নিঝুম দুপুর। ফ্ল্যাটের মার্বেল-মেঝেয় থেবড়ে বসে পড়ে ‘গোপন কথা’। শাড়ি গুটিয়ে নেয় হাঁটুর উপরে। কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে মুখ। মুখের কাছে চলে আসে কান। ফড়িংয়ের ডানার শব্দের মতো শব্দের তরঙ্গ তুলে বেরিয়ে আসে গোপন কথা। কোনও গ্যাজেট, কোনও অ্যাপ তাকে সরাতে পারেনি। জলের গন্ধের মতো, শ্যাওলার রঙের মতো সে থেকে গিয়েছে। তাকে সরায় কার সাধ্যি!

Loading...

Comments

comments