TOP সোশ্যাল

১৮ বছর হর্ন দেননি, গাড়ি চালিয়ে নজির গড়লেন কলকাতার দীপক দাস

Loading...
টানা ১৮ বছর ধরে কখনও হর্ন বাজাননি তিনি৷ অসহিষ্ণু পৃথিবীর বুকে , কে এই একবিংশ শতাব্দীর আশ্চর্য মানুষ?
ছোট্ট একটা খবর৷ ‘পাটুলির ‘মানুষ মেলা ’য় শনিবার সন্ধ্যায় পুরস্কৃত করা হবে দীপক দাসকে৷ কারণ ? ব্যস্ত শহর কলকাতার বুকে প্রতিদিন গাড়ি চালালেও , টানা ১৮ বছর ধরে কখনও হর্ন বাজাননি তিনি৷ অসহিষ্ণু পৃথিবীর বুকে , কে এই একবিংশ শতাব্দীর আশ্চর্য মানুষ ? সন্ধান পেতে হাজির হয়েছিলাম পাটুলির কাছের মেট্রো স্টেশন , ‘ক্ষুদিরাম ”-এ৷ দীপকবাবুর কীর্তি-কথা শুনে অবাক , স্টেশন মাস্টার শুভাশিস বিশ্বাস৷ ‘এমন মানুষ এখানে আছেন ! জানি না তো ! যদি তাঁর দেখা পান , আমার স্যালুট জানাবেন৷ ’ অগত্যা সাইকেল রিকশা চেপে , গন্তব্য পাটুলি থানা৷ শরণাপন্ন হতে হল থানার ওসি অভিজিত্ ঘোষের৷ দীপকবাবুর কথা শুনে তাঁর বক্তব্য , ‘ওনার গাড়ির হর্ন খারাপ না তো ?” খারাপ হলেও , তা ১৮ বছর ধরে ? ‘এমন মানুষের কথা তো আমার জানা নেই৷ জানতে পারলেই , আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে৷ ’ ব্যর্থ হয়ে থানার গেটের সামনে আসতেই , এগিয়ে এলেন এক পুলিশকর্মী৷ ‘বলছি কী , থানায় ‘মানুষ মেলা ’র লেটার হেডে একটা চিঠি জমা রয়েছে৷ দেখুন , ওতে যদি মেলা -উদ্যোক্তার নাম -ফোন নম্বর পেয়ে যান৷ ’ তাঁর কথা মতোই ফাইলের চিঠিতে পাওয়া গেল মেলা -উদ্যোক্তা সৈকত সরকারের নাম , নম্বর৷ তাঁর কাছ থেকেই জোগাড় হল দীপকবাবুর নম্বর৷

ফোনে ধরতেই দীপকবাবু জানালেন , ‘আমি তো ডিউটিতে৷ আপনার ওইদিকেই যাচ্ছি৷ আধঘণ্টার মধ্যে মেট্রো ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারির সামনে আসতে পারবেন ? যেতে যেতে কথা হবে৷ ’ সেই মতোই দাঁড়ালাম৷ ঠিক সময়েই নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো রুপোলি ওয়গন -আর৷ গাড়ির ভিতর থেকে হাসিমুখে হাত নাড়লেন , বছর ৫২ -র দীপকবাবু৷ ‘চলুন বাড়ি৷ ওখানে বসে কথা সেরে, তারপর যাব৷ ’ কথামতো গাড়িতে বসা গেল৷ তাঁর ফ্ল্যাটের সাদা দরজায় কোনও নাম নেই!

সাঁটা এক রাক্ষসের ছবি , লেখা ‘শব্দরাক্ষস’৷ ঘরের ইতিউতি সাঁটা পোস্টার ‘ডু নট হঙ্ক ইয়োর হর্ন‘, ‘হর্ন ইজ আ কনসেপ্ট , আই কেয়ার ফর ইয়োর হার্ট….. দীপক৷ ’ স্ত্রী রীতা , কন্যা অমৃতাকে নিয়ে দীপকবাবুর ছোট্ট সংসার৷ বসার ঘরে ছোট এক বুক-সেলফ৷ তাতে ভর্তি বই৷ বেশ কিছু কবিতার৷ কবিতা ভালোবাসেন বুঝি ? ‘একটু-আধটু লিখিও৷ এই কবিতার জন্যই তো আজ আপনি এখানে৷ ’ লাজুক হাসিতে জানালেন দীপকবাবু৷ তার মানে ? ‘মানে , এই যে গাড়ি চালাতে হর্ন বাজাই না , শব্দ করি না , সেটা তো কবিতার জন্যই৷ ’ কী রকম ? ‘২০০০ সালে মেয়ে হয়৷ তখন নিজের একটা সুমো ছিল৷ তার আগের কথা , কী বলি ? বারো ক্লাস অবধি পড়ে, লেখাপড়া ছেড়ে দিই৷ এক সময় সাইকেল চালিয়ে, লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ দিয়েছি৷
ময়দান মেট্রো রেলে হেল্পারের কাজ করেছি৷ মামা গাড়ি চালাতে , তাঁর কাছে গাড়ি চালানো শিখে , ৫ ডিসেম্বর ১৯৯১ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাই৷ তারপর টুকটাক এর-তার গাড়ি চালিয়ে, ধার করে একটা সুমো কিনি৷ সেটাই চালাতাম৷ ১০-১২ বছর টেনেছি৷ কিন্তু ধার ঠিকমতো শোধ করতে না পারায় , বছর দু’য়েক হল সেটা একজনকে দিয়ে, এখন একজনের এই গাড়িটা চালাই,’ বলছিলেন দীপক৷

যোগ করলেন , ‘এক প্যাসেঞ্জারকে নিয়ে গল্ফ গ্রিন গেছি৷ তাঁকে ছেড় , ওখানে একটা গাছের নীচে বসে , একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম৷ তখন বাচ্ছাদের স্কুল ছুটি হয়েছে৷ চারিদিকে শুধু গাড়ি৷ বিকট হর্নের শব্দ৷ কে আগে যাবে! শব্দবাজি তো ৬৫ ডেসিবেলের বেশি হবে না জানি , কিন্তু হর্নের শব্দ ? কত ডেসিবেল অবধি ? জানি না৷ ওই বিকট শব্দের মাঝেই বসে পড়ছিলাম , জীবনানন্দ দাশের একটা কবিতা৷ সেখানে একটা লাইন ছিল , ‘এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্ণে শান্তি আসে মানুষের মনে৷ ‘ এই লাইনটাই যে কীভাবে মনে গেঁথে গেল ! সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম , আজ থেকে কিছুতেই আর হর্ন বাজাব না৷ শব্দ করব না৷

সেই শুরু৷ তারপর আজ অবধি জীবনে হর্ন বাজাইনি৷ গাড়ি থেকে হর্ন খুলেই দিয়েছিলাম৷ ‘বলেন কী ! অসুবিধে হইনি ? ‘না ! কীসের অসুবিধে ! হর্ন না বাজিয়ে , গাড়ি নিয়ে কোথায় না গেছি ? সুন্দরবন , শিলিগুড়ি , সেখান থেকে মিরিক হয়ে বাঘমুন্ডি ! ননস্টপ ন ’ঘন্টা গাড়ি চালিয়েছি৷ গাড়িতে হর্নই নেই৷ ’ তা হলে গাড়িতে হর্ন থাকে কেন ? ‘ভগবানই জানেন ! আপনি ঠাকুর নমস্কার করেন কেন ? জানেন ? সে রকমই৷ সকলে জানেন , গাড়িতে হর্ন থাকলেই বুঝি বাজাতে হয়৷ আমি ওই সকলের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি৷ আসল কথাটা কী জানেন ? টাইম , স্পিড অ্যান্ড স্পেস৷ এটা ঠিক না থাকলে , গাড়ি কেন জীবনও ঠিক চলবে না৷ আর এই তিনটেকেই বাঁধতে হয় ধৈর্য্য দিয়ে৷ তা হলেই সব সম্ভব৷

লোকে আগে আমাকে ‘পাগল ’ বলতো৷ আজ তারাই সম্মান করে৷ তাদের দেখিয়ে দিয়েছি , সাধনা দিয়ে সব সম্ভব৷ জানেন , স্টেট ব্যাঙ্কের একজন একবার গাড়িতে উঠেছিলেন৷ নেমে যাওয়ার সময় , নম্বর নিয়েছিলেন৷ বেশ কয়েকদিন পর , হঠাত্ একদিন ফোন করে ওনাদের হেড অফিসে যেতে বলেন৷ গিয়ে দেখি , সেখানে একটা সাদা বোর্ডে লেখা , ‘শব্দদূষণ নিয়ে বক্তব্য রাখবেন গাড়িচালক দীপক দাস৷ ’ বক্তব্য রেখেছিলাম৷ তবে সেই দিনটার মতো আনন্দ , জীবনে পাইনি৷ আজও ভাবি , সরকারি , প্রশাসনিক মহল থেকে যদি একটু সুযোগ পেতাম , তা হলে কলকাতা শহরকে কীভাবে শব্দমুক্ত বানাতে হয় , সেটা করে দেখাতাম৷ কথায় না , কাজে৷ ’কিন্তু হর্ন না বাজানোয় , ব্যস্ত সওয়ারির কোনও সমস্যা হয়নি ? ‘না৷ এমন আদেশ দু’-একবার এসেছিল৷ কিন্তু তাঁদের হাত জোড় করে বলেছি , আমায় কোনও টাকা দিতে হবে না৷ প্লিজ , অসুবিধে হলে নেমে যান৷ আমার গাড়ি কোনও শব্দ করবে না , সরি৷ কেন অকারণ এত শব্দ বলতে পারেন ? এই তো আমার মেয়ে ক্লাস টুয়েলভে পড়ে৷ সাইকেল চালিয়ে পড়তে যায়৷ ওর সাইকেলে কোনও বেলই নেই৷ অতটুকু মেয়ে কী করে চালাচ্ছে ? আসলে শব্দ করলেই শব্দ , না করলেই নয়৷ ” তা আপনার বাড়ির দরজায় বেল বাজে তো …নাকি ? ‘এইটা ভালো বলেছেন৷ হুম , বেল একটা আছে বটে , তবে ওটাকে এবার সরাবো৷ ওটা খুলে , মাটির একটা ঘণ্টার ব্যবস্থা করব৷ এই নতুন বছরেই …দেখি৷ ’

সুত্র ঃ এইসময়

আরও পড়ুন

বয়সে ছোট ছেলেকে বিয়ে করতে আগ্রহী ৯৭% ভারতীয় মেয়ে! বলছে সমীক্ষা

নারী পুরুষের মধ্যে রয়েছে ১০টি মানসিক পার্থক্য জানলে অবাক হবেন

জেনে নিন ঘরের মধ্যে কর্পুর রাখার কিছু উপকারিতা

আপনি কি জানেন কোন কোন বিষয়ে পূর্বজন্ম প্রভাব ফেলে এই জন্মে?

Loading...

Comments

comments